৭ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে একটি ঐতিহাসিক দিন । কার্যত “বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতা ঘোষণা” দিবস। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ প্রায় ১০ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ( বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ মিনিটের এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণের প্রথম অংশে তিনি পাকিস্তান শাসনামলের শাসন-শোষণ, দমন, নিপীড়ন, বঞ্চনা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরেন। দ্বিতীয়াংশে বাঙালির মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের আহবান জানান। আবেগে, বক্তব্যে, দিকনির্দেশনায় ভাষণটি ছিল অনবদ্য। এ ভাষণকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের সাথে তুলনা করা হয়। ২০১৭ সালে ভাষণটি জাতিসংঘের “ইউনেস্কো কর্তৃক মেমোরি অব দ্য ওয়াল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে” অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ভারত বর্ষে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয় ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কবল থেকে মুক্ত স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম হওয়াতে বঙ্গবন্ধু একদিকে যেমন আনন্দিত হয়েছিলেন তেমনি অন্যদিকে হয়েছিলেন আতংকিত। কারণ, অতল সমুদ্রের মত জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার অধিকারী বঙ্গবন্ধু জানতেন ভৌগোলিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শুধু ধর্মের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অভ্যুদয় ঘটে। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের ইতিহাস ছিল শোষণ এবং বঞ্চনার। শুরুতেই দেখা দেয় ভাষাগত বিরোধ। পূর্ববাংলার জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে ধর্মের ভিত্তিতে ৪৭’এর দেশ ভাগ সালমান রুশদীর ‘মিডনাইট ক্রাইসিস’ বা মধ্যরাতের ব্যর্থতায় পরিনত হলো। ৫২’র ভাষা আন্দোলন এক নতুন দিক দর্শন নিয়ে হাজির হলো পূর্ববাংলায়। এই আন্দোলন পূর্ববাংলার জনগণের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। মুলত এ আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনার ফসল হলো ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক আইয়ুব খান ক্ষমতাচ্যুত হন। নতুন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। গণতন্ত্রের ধারা অনুসারে পাকিস্তানের শাসনভার পাওয়ার কথা আওয়ামীলীগের অর্থাৎ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ও গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কোন কারণ ছাড়াই পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ফলে পূর্ববাংলায় বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। “ভুট্টোর মাথায় লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন কর “, ‘জয় বাংলা ‘ ‘ বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জাগো বাঙালি জাগো’ ইত্যাদি শ্লোগানে শহর-বন্দর-গ্রাম আন্দোলিত হলো। বঙ্গবন্ধু অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। পূর্ববাংলায় কেন্দ্রীয় সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই আর বলবৎ রইলো না। ঢাকায় ছাত্ররা গঠন করলেন ‘ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘। পরিস্থিতির চাপে ভীত সন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগকে ম্যাসেজ দেয়া হয়, ৭ মার্চ কোনভাবেেই যেন স্বাধীনতা ঘোষণা করা না হয়। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী নানা কৌশলে কালক্ষেপণ করছিল এবং বাঙালির বিরুদ্ধে হামলে পড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়। মেজর সিদ্দিক মালিকের গ্রন্থ থেকে পাই- পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চ জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামীলীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন “পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের ( বাঙালি ) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না ” এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মুখে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের নিগড় থেকে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। তিনি বজ্রকন্ঠে ঘোষণা দেন- ” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সেদিন তিনি পরোক্ষভাবে একদিকে যেমন গেরিলাযুদ্ধের ঘোষণা দেন অন্যদিকে তেমনি যুদ্ধে কীভাবে জয়ী হতে হবে সে ব্যাপারেও দিক নির্দেশনা দেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈধ সরকার প্রধানের মত বলেন-“২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।………..যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে, ততদিন খাজনা -ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না।” অনেকের মত বঙ্গবন্ধুও আশঙ্কা করেছিলেন তাঁকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তাই তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আপমর জনতার উদ্দেশ্যে আগাম সতর্কতা হিসেবে বলেন -“আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।” অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানেও বাঙালি যেন শত্রুর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করাই ৭ মার্চের মুলসুর। ৭ মার্চের ভাষণ পর্যালোচনা করলে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতার পরিচয় পাই। সেদিন তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণটি অলিখিত হওয়ায় তিনি ছাড়া কেউই জানতে পারেনি জনসভায় কী ঘোষণা আসছে?
সেদিন, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও তাঁর বাগ্মীতা ও শব্দ চয়নে চমৎকারিত্বে কেউ তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হিসেবে অভিযুক্ত করেনি। এমনকি পাকিস্তান ভাঙার দায়ভার কাঁধে চাপিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে সামরিক জান্তা তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে চতুর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন-” শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে চলে গেল কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না। ( ডয়েচে ভেলে ৩১ অক্টোবর ২০১৭)। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর কৌশলের কারণে সামরিক জান্তার সকল প্রস্ততি থাকা সত্ত্বেও সেদিন জনসভায় হামলা হয়নি। পূর্বপাকিস্তানের অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করতে। এসময় ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। অপরদিকে গোপন আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য, গোলাবারুদ এনে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট ‘ শুরু হয়। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন যা ৭ মার্চের ঘোষণার ধারাবাহিকতামাত্র।
রেশমা আখতার( ডলি)
সাংগঠনিক সম্পাদক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ












