গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের রূপকার কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী

0
89
প্রকৌশলী মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী। ফাইল ছবি

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের রূপকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান গণমানুষের প্রকৌশলী মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রকৌশলী তিনি। একজন সাধারণ জীবন যাপনের মানুষ, একজন দক্ষ প্রকৌশলী। স্বীয় যোগ্যতা দক্ষতা ও অসীম ধীশক্তির অধিকারী এই মানুষটি নিজের কর্মগুণে বাংলাদেশ তথা বিশ্ব দরবারে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে একটা সময় সাধারণ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ।

গতকাল সোমবার (২০ জানুয়ারি) ছিল তাঁর ৭৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৫ সালের এইদিনে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এই খ্যাতিমান প্রকৌশলী৷ পিতা কৃষিচিন্তক প্রয়াত নূরুল ইসলাম সিদ্দিক এবং রত্নগর্ভা মা বেগম হামিদা সিদ্দিকের দ্বিতীয় সন্তান সিদ্দিকের শৈশব ও শিক্ষা জীবনের প্রথম অধ্যায় কাটে লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ এবং মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিধন্য কুষ্টিয়ায়৷

১৯৬৬ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন৷ ১৯৬৭ সালে জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে জন্মশহর কুষ্টিয়াতেই তিনি কর্মজীবন শুরু করেন৷ একাত্তরের ৩০ এপ্রিল তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন৷ পরে ভারতের ‘বেতাই’ ইয়ুথ ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করেন৷ বৃহত্তর কুষ্টিয়া এবং পাবনা অঞ্চল নিয়ে গঠিত জোনাল কাউন্সিলের অন্যতম সহযোগী যোদ্ধা হিসেবে তিনি মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত করে প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেন৷

‘জোনাল ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্টের নকশা প্রণয়ন করে অপারেশনে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন৷ ১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আরবান এন্ড রিজিওন্যাল প্ল্যানিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন৷ দীর্ঘ তিন যুগ তিনি ওয়ার্কস প্রোগ্রামের উপ-প্রধান প্রকৌশলী, এলজিইবির প্রকৌশল উপদেষ্টা এবং এলজিইডির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মডেল হিসেবে এলজিইডিকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করেছেন৷

১৯৯৯ সালের মে মাসে পিডিবির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পূর্বপর্যন্ত প্রায় ৩৩ বছর উল্লেখিত পদসমূহে নিরলস দায়িত্ব পালন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রবাদপুরুষে পরিণত হন৷ তিনি নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন৷ কৃষি ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে ইরি চাষের মাধ্যমে দেশের খাদ্যচাহিদা পুরণে অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনার ধারণায় তিনি বাংলাদেশে ‘Ruber Dam’ স্থাপন এবং এই প্রযুক্তিকে জনপ্রিয় করেন৷

জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নসমূহের মুল মানচিত্র প্রস্তুতির জন্য ভৌগলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) চালু করে তথ্য মাধ্যমে বিপ্লব সাধন করেন৷ জাইকার সাহায্যপুষ্ট আদর্শ গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প (এমআরডিপি) সহ গ্রামীণ রাস্তা, সেতু, সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, সমাজ উন্নয়ন ও সমবায় ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ, জরুরি দুর্যোগ প্রশমন কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজনীয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে তিনি সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন৷

কাজের উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রয়াত এই গুণি প্রকৌশলী ভাসানী স্বর্ণপদক (১৯৯৫), কবি জসীম উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), আইইবি স্বর্ণপদক (১৯৯৮), সিআর দাস স্বর্ণপদক (১৯৯৯), আব্বাস উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯৯), শেরেবাংলা স্বর্ণপদক (২০০০), বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী স্বর্ণপদক (২০০০), জাইকা মেরিট অ্যাওয়ার্ড (২০০০), বিএসিই সিলভার জুবিলি অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন৷ যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ডধারী প্রকৌশলী সিদ্দিককে বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য বিশ্বব্যাংক ১৯৯৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল রোড ফেডারেশন কতর্ৃক পার্সন অব দ্য ইয়ারএ ভূষিত হন৷ ২০০৩-২০০৪ মেয়াদে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপ-দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রথম চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন৷

কর্মজীবনে প্রয়াত এই গুণীব্যাক্তি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-এর সভাপতি, বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য শক্তি সমিতি-এর সভাপতি, নগর উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ফোরাম-এর সভাপতি, ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ-এর সরকারি পরিচালনা পর্ষদ-এর কনভেয়র, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ কমিটির সভাপতি, সিদ্দিক’স ফাউন্ডডেশন, কুষ্টিয়ার সভাপতি, বেগম হামিদা সিদ্দিক কলেজিয়েট স্কুলের সভাপতি, ঢাকাস্থ কুষ্টিয়া জেলা সমিতির সভাপতি, গুলশান সোসাইটির সহ-সভাপতি, আই কেয়ার সোসাইটি-এর সহ-সভাপতি, কাজী আবু মোকাররম ফজলুল বারী ইসলামিক ফাউন্ডেশন সেন্টারের উপদেষ্টা ও ২০০২-‘০৩ মেয়াদে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইইবি) তিনি নির্বাচিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন৷

ধর্মপরায়ণ ও সংস্কৃতিবান কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী অন্তপ্রাণ৷ লালনসঙ্গীত ছিল তাঁর অবসরের প্রিয় শ্রবণ৷ তিনি আমৃতু্য কুষ্টিয়াস্থ বারোশরীফ দরবার ও মসজিদ কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আধ্যাত্মবাদের মর্মবাণী প্রচারে আকুল ছিলেন৷

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রবাদ পুরুষ কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ যুক্তরাষ্ট্রে তার ছেলের বাসভবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃতু্যবরণ করেন৷ মৃতু্যকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর৷ মৃতু্যর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ জল অংশীদারি (বিডাব্লিওপি ) এবং পল্লী পরিবহন উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় ফোরাম-এর প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন।

LEAVE A REPLY