ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্মাননা পাবেন না

0
30

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন আইন হচ্ছে। এই আইনে স্বেচ্ছায় ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কোনো সম্মাননা পাবেন না। তারা রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। পাশাপাশি পেশাজীবী, ব্যবসায়িক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির কোনো পদেও থাকতে পারবেন না।

এসব ধারা যুক্ত করে সরকার ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২০’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এ আইনটি বিদ্যমান ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩’ রহিত করে জারি করা হবে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এই আইনের একটি খসড়াও প্রণয়ন করা হয়েছে।

নতুন আইনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা ৪ জন বাড়িয়ে ১৫ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ শেয়ার ধারণের সীমা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বশেষ ১৯৯৩ সালে আইন করা হয়, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩ নামে পরিচিত। এ আইন রহিত করে ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২০’ নামে নতুন আইন হচ্ছে। সবাইকে মতামত জানানোর জন্য গতকাল রোববার আইনটির খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্মরত রয়েছে।

খসড়া আইন ও বর্তমান আইন তুলনা করে দেখা গেছে, নতুন আইনে মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খসড়া আইনে ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে কিছু ধারা যোগ করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত বা স্বেচ্ছা খেলাপি বিষয়ে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও কোনো আইনে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। এই প্রথম কাদের ইচ্ছাকৃত খেলাপি বলা হবে তা আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হলো। পাশাপাশি খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কটের প্রস্তাব রয়েছে নতুন আইনের খসড়ায়।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানির পর্ষদে সর্বোচ্চ ১৫ জন সদস্য বা পরিচালক থাকবেন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৩ জন থাকবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। তবে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। আর যেসব পরিবারের ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার থাকবে, সেই পরিবার থেকে ২ জন পরিচালক থাকতে পারবেন। আর যেসব পরিবারের শেয়ারের পরিমাণ ২ শতাংশের বেশি কিন্তু ৫ শতাংশের কম, সেই পরিবার থেকে একজন পরিচালক থাকতে পারবেন। প্রত্যেক পরিচালকের মেয়াদ হবে তিন বছর। পরপর তিন মেয়াদে থাকতে পারবেন একজন পরিচালক। এরপর পদত্যাগ করে তিন বছর পর পুনরায় পরিচালক নির্বাচিত হতে পারবেন। এর আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকদের মেয়াদে এ ধরনের পরিবর্তন আনে সরকার। তখন আর্থিক খাতের বিশ্নেষকরা সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি বা তাদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি এবং একই গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আলাদা সত্তা থাকা সত্ত্বেও কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানির ১৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে না। তবে বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স কোম্পানির শেয়ার ধারণের সর্বোচ্চ সীমা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারণ করবে।

এতে বলা হয়েছে, কোনো ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণের ৬ মাস পরে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। আর কোনো গ্রাহক তার নিজের বা স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ বা ঋণের অংশ বা ঋণের সুদ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিশোধ না করলে তা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন। জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে ঋণ নিলেও তাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যে উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, গ্রাহক ঋণের অর্থ সেই কাজে ব্যবহার না করে অন্য কাজে ব্যবহার করলেও ওই গ্রাহককে স্বেচ্ছা খেলাপি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমনকি জামানত ঋণ প্রদানকারী ফাইন্যান্স কোম্পানির অজ্ঞাতে হস্তান্তর বা স্থানান্তর করলেও গ্রাহককে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। নতুন আইনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নয়ন অর্থায়নের পাশাপাশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সরবরাহ এবং সিকিউরিটাইজেশনসহ কাঠামোগত অর্থায়নে জোর দেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY