রেশমা আক্তার ডলিঃ হ্নদয়ে বঙ্গবন্ধু

0
186

সর্বপ্রকার অন্যায়-অবিচার, শোষণ – যন্ত্রণার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক সোচ্চারিত বজ্রকন্ঠ-কোন রক্তচক্ষু, গণ-অধিকার হরণকারী সামরিক জান্তার বুলেট,বেয়নেট,বন্দুক তাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি, পারেনি তাঁর সংগ্রামী আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুৎ করতে। জীবনে শেখ মুজিবের পরম সাথী তাঁর বন্ধু -বান্ধব ও সংগ্রাম। “বন্ধু মুজিব রাজনৈতিক আন্দোলনে মুজিব ভাই, জীবনপণ সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতির জনক- এর প্রতিটি বিবর্তনের মুলে রয়েছে মুজিব -জীবনের সংগ্রাম-নিষ্ঠা-সংগ্রাম।” দীর্ঘ সংগ্রাম ও কারাভোগের জীবনে বঙ্গবন্ধুকে আমরা বিভিন্ন রূপে দেখতে পাই – এক. সংগ্রামী রূপে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনের মূল কথা। দুই. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূর্ত প্রতীক । তিন. বাঙালি জাতীয়তাবাদী দর্শন ও চেতনার উদগাতা। চার. মহামানব। পাঁচ. একজন কবি। একজন রাজনীতির কবি হিসেবে- শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হ্নদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দোয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী? গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাংলার মানুষের ভালবাসা, দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা সেইসাথে আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭২ সালের ১০ ই জানুয়ারী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলায় ফিরে এলেন বাঙালির গর্ব- বাঙালির ধন, মান, প্রাণ, জনদরদী নেতা, জনতার মহান বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আবারো ঝাঁপিয়ে পড়লেন সংগ্রামে। এবারের সংগ্রাম যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আত্ননির্ভরশীলতা অর্জনের সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর সরকার মাত্র দশ মাসের মাথায় বাংলাদেশকে একটি সংবিধান উপহার দেন। সেইসাথে – বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ, পরিত্যক্ত কারখানা জাতীয় করণ, প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, শিক্ষানীতি প্রণয়ন, রেশনিং প্রথা চালু,পাঁচশালা পরিকল্পনা, ভারতীয় মিত্র বাহিনী ফেরত পাঠানো, স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে ১৪০ টি দেশের স্বীকৃতি আদায়, কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩-৭৪ সালের বন্যায় দেশে খাদ্য উৎপাদন মারাত্নকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। দেশের অভ্যন্তরে মওজুদদার, দুর্নীতিবাজ এবং ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী তৎপর হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর সরকার জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে “দ্বিতীয় বিপ্লব” নামে একটি নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। কিন্তুু বাংলার এই মাটি যেমনি জন্ম দিয়েছে শেখ মুজিব, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, নেতাজি সুভাষ বোস,প্রীতিলতাকে তেমনি জন্মদিয়েছে মীরজাফর, মীরন আর জগৎ শেঠের। ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকা বেঈমান বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্তের চুড়ান্ত বহি:প্রকাশ ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট। সেদিন- তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম বুট, সৈনিকের টুপি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিলো, তারা ব্যবহার করেছিল এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো দেখতে, এবং ওরা মানুষই ওরা বাংলার মানুষ স্বাধীনতার ফসল চলে যায় বেঈমান -বিশ্বাসঘাতকদের গোলায়- বাংলার মাটি থেকে ঝরে গেল একটি ফুটন্ত গোলাপ। ওপরতলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে রক্তের স্রোত। ওপরের সিঁড়ির ঠিক তিনটা ধাপ নীচে নিথর পড়ে রইলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির নয়নের মনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাথা ওপরে, পা নীচের দিকে। ঘাতকের বুলেট উড়িয়ে নিয়ে গেছে তাঁর সেই বিখ্যাত তর্জনী! যে তর্জনী উচিয়ে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের। যে মানুষটি ভালবেসেছিলেন বাংলাকে, বাংলার দু:খী মজুর মেহনতী মানুষকে, যে মানুষটি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিশালী এক সোনার বাংলার, যিনি চেয়েছিলেন এদেশের গরীব-দু:খী, শতাব্দীর বল্গাহীন শোষণে জর্জরিত সর্বহারা বঞ্চিত মানুষের জন্য এক সুখী সমৃদ্ধশালী আত্ননির্ভরশীল শোষণহীন নিরুদ্বিগ্ন জীবন- সেই মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই-বজ্রকন্ঠের সবাক প্রতিধ্বনি আর এই বাংলায় অনুরণিত হয় না। বরং এর বদলে শোকাহত অশ্রুসিক্ত ভাই- বোন আর মায়েদের অন্তরে নিরন্তর প্রতিধ্বনিত হয় মহান নেতার শেষ মুহুর্তের আর্তনাদ -; “আমার জীবন দিয়ে তোমাদের ভালবাসার ঋণ পরিশোধ করে গেলাম “- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আসুন, আমরা সবাই বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরবর্তী সংকট উত্তরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে সবাত্নক সহযোগিতা করি। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক-প্রকৌশলী রেশমা আক্তার ডলি, সাংগঠনিক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ [ কৃতজ্ঞতা স্বীকার: প্রয়াত লেখক, সাংবাদিক মিজানুর রহমান মিজান, বিটিভির তৎকালীন ঊর্ধ্বতন চিত্রগ্রাহক জিয়াউল হক, কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং কবি শহীদ কাদরী]

LEAVE A REPLY