বৈশ্বিক মহামারী করোনা ও দেবদাস

0
73

রেশমা আক্তার ডলি

‘এখন এতদিনে পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না। শুধু দেবদাসের জন‍্য বড় কষ্ট হয়। তোমরা যে-কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়তো আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনও দেবদাসের মত এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন‍্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত‍্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহ- কর স্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে- যেন একটিও করুনার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এই জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া মরিতে পারে।’-
উদ্ধৃতাংশটুকু বাঙালির বেদনার বিশ্বস্ত রূপকার অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রণয়ধর্মী উপন‍্যাস ‘দেবদাস’ এর দেবদাস চরিত্রের করুণ পরিণতির আখ‍্যানভাগ। যেখানে জীবনের সমগ্রতাই প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, শেষাংশে লেখকের জীবনদর্শন ও জীবনবোধের প্রকাশও লক্ষণীয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে সাহিত‍্যপ্রেমীদের মধ‍্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি দেবদাসের কাহিনী জানেননা। কারণ বাংলা, হিন্দি, তামিল,তেলেগু,উর্দু, মালয়ালম ও অসমীয়া ভাষায় উপন‍্যাসটি অনূদিত হয়েছে। সাহিত‍্যপ্রেমীদের বাইরে আমজনতার কাছে দেবদাস বিরহকাতর চিরায়ত প্রেমিকের ধ্রুপদী নিদর্শন হিসেবে গণ‍্য। তাদের আনন্দদানে,পারুর জন‍্য দেবদাসের বিরহ উপজীব‍্য করে রচিত এই উপন‍্যাস অবলম্বনে ভারতীয় উপমহাদেশে এই পযর্ন্ত ১৯ টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
উপন‍্যাসে লেখক সাধুভাষার ঐশ্বর্য ও ঋদ্ধি এবং চলিত ভাষার সৌকর্য ও সিদ্ধি এই উভয়ের সমন্বয় সাধনের মাধ‍্যমে ত‍ৎকালীন বঙ্গসমাজের কৃত্রিম জাতিভেদের নিষ্ঠুরতার চিত্র কঠোরভাবে তুলে ধরেছেন। যে সমাজব‍্যবস্থা শৈশবের খেলার সাথী, কৈশোরের বন্ধু, যৌবনের প্রেমিক হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, শুধু সত‍্যিকারের প্রেমের শুভ পরিনতির এক বৃহৎ বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একই সাথে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ভয়াবহ পরিনতি রাজক্ষয় (যক্ষা) রোগ। যা চলমান বৈশ্বিক মহামারী করোনায় প্রাসঙ্গিকতা পায়। যক্ষা করোনার মত সংক্রামক ব‍্যাধি। যক্ষা রোগিকে করোনা আক্রান্ত ব‍্যক্তির মত আইসোলেশনে রাখা হতো। তাঁর পরিধেয় বস্ত্রাদি পুড়িয়ে অথবা পুঁতে ফেলা হতো। যক্ষারোগে মারা গেলে তাঁর সৎকার বা দাফনের বিষয়ে বিশেষ ব‍্যবস্থা নেওয়া হতো।
পক্ষান্তরে, বৈশ্বিক মহামারী করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্ত ব‍্যক্তিদের বক্তব‍্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেবদাসের মত নিসঙ্গ করুণ মৃত্যুদৃশ‍্য পরিলক্ষিত হয়।
বাংলার সাহিত‍্য গগনে যখন বঙ্কিম প্রতিভা অস্তমিত এবং রবীন্দ্রনাথ পূর্ণ দীপ্তিতে ভাস্বর, তখনই শরৎকালের পূর্ণচন্দ্রের স্নিন্ধ জ‍্যোতি নিয়ে শরৎচন্দ্রের বিস্ময়কর আবির্ভাব। সাধারণ বাঙালি জীবনের দৈনন্দিন হাসি- কান্নার উপাখ‍্যান প্রীতি ও করুণার রসে সিক্ত করে সাহিত্যপ্রেমীদের তিনি একে একে উপহার দেন শ্রীকান্ত,দত্তা,চরিত্রহীন,গৃহদাহ, বিরাজবৌ, পরিণীতা, শেষপ্রশ্ন, বড়দিদি,পথের দাবী, পল্লীসমাজ, দেনাপাওনা, বামুনের মেয়ে, বৈকুন্ঠের উইল, অরক্ষণীয়ার মত উপন‍্যাস। এছাড়া, বেদনালাঞ্ছিত মানবতার রূপ এঁকেছেন মহেশ, রামের সুমতি, মেজদিদি, বিন্দুর ছেলে,ছবি, পন্ডিতমশাই, হরলক্ষী বিলাসী
ছোটগল্পে।
বাঙালি ঔপন্যাসিকদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থানকারী শরৎবাবু শুধু সাহিত‍্যই রচনা করেন নাই, ১৯২১ সালে তিনি অসহযোগ আন্দোলনেও যোগ দেন।
১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলার একান্ত দরদী কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এ ধরাধামে আবির্ভূত হন। সেই হিসেবে আজ তাঁর শুভ জন্মদিন।
জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
একইসাথে দেবদাসের মত করুণ মৃত্যু যেন কারো না ঘটে সেই কামনা করি।

লেখকঃ রেশমা আক্তার ডলি
সাংগঠনিক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ

LEAVE A REPLY