আমার নেত্রী এবং আমার স্বপ্ন পূরণের প্রথম দিন

0
63

প্রকৌশলী রেশমা আখতার(ডলি)

 চারিদিকে উৎসবের আমেজ।পোস্টার আর ফেষ্টুনে ছেয়ে গেছে শিল্পী নগরী খুলনা।আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ উপলক্ষ্যে প্রতিদিন কোনা না কোন সভা – সমাবেশ, চলছে প্রচার, বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে মাইকিং, চায়ের দোকানে নির্বাচনী আড্ডা। প্রাচীন এবং বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী জননেত্রী ও গণতন্ত্রের মানসকন্যা বঙ্গবন্ধু তনয়া দেলরত্ন শেখ হাসিনা সিলেটে বড়পীর হযরত শাহজালাল ( রা:) এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন এবং শেষ করবেন আওয়ামী লীগের দূর্গ খ্যাত দক্ষিণ বঙ্গে প্রচারের মধ্য দিয়ে।

১৯৯১ সাল। আমি তখন বিআইটি,খুলনার প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আগে থেকেই কবিতা আবৃত্তি শাখায় উদীচীর সাথে যুক্ত। শিক্ষক হিসেবে পাই খুলনা বেতারের নাট্যশিল্পী আব্দুস সবুর এবং ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়কে। তাঁদের নেতৃত্বে উদীচীর ব্যানারে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ। বিআইটি খুলনার ৮৯ ব্যাচের প্রথম বর্ষ সমাপ্তির নির্ধারিত সময়সীমা নভেম্বর,১৯৯০ সাল। কিন্তু বিআইটি আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কারণে এক বছরের সেশনজট।

দীর্ঘ ৬ (ছয়) বছর বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য মাননীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। এরপর সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে বারবার গৃহবন্দী ও হত্যার হুমকি উপেক্ষা করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তিনি দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়ান। আওয়ামী লীগের শতশত নেতা কর্মী, বসুনিয়া, দিপালী ও নুর হোসেনের রক্তের বিনিময়ে ১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর দেশ থেকে সর্বশেষ সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগের মাধ্য দিয়ে তাঁর ১৫ (পনের) বছরের সংগ্রাম সফলতা পায়। খুলনাবাসী তাই নির্বাচনী প্রচারের জনসভায় সভানেত্রীকে গণসংবর্ধনা দিতে প্রস্তুত। প্রস্তুত উদীচী শিল্পগোষ্ঠীও তাঁদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। সন্ধ্যা থেকেই হাজার হাজার নেতাকর্মী হাদিস পার্কে জমায়েত হতে শুরু করেছে। আমরা মঞ্চের বামপাশে আমাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করছি। মঞ্চে অংগসংগঠনের নেতাকর্মীদের বক্তব্য চলছে। বিভিন্ন জনসভা এবং পথসভা শেষে সভানেত্রী যখন হাদিস পার্কে পৌঁছিলেন তখন ঘড়ির কাঁটা ১০ টা ছুঁই ছুঁই । চারিদিক থেকে ভেসে আসা মুহুর্মুহু শ্লোগানে সৃষ্টি হলো আবেগঘন এক পরিবেশ।সেই আবেগঘন পরিবেশে নেতাকর্মী দিয়ে পরিবেষ্টিত বাতুলতার রং তুলির আঁচড়ে অনাগ্রহী, সাদামাটা জীবন প্রবাহে অভ্যস্ত, তাঁতের শাড়ি পরিহিতিা জননেত্রী মঞ্চে উঠলেন। জননেত্রীর সাথে মঞ্চে উপবিষ্ট মোস্তফা রশীদী সুজা ভাই, সৈয়দ মঞ্জুরুল ইমাম, হারুনুর রশীদ হারুন ভাই, পঞ্চানন বিশ্বাস, নারায়ণ চন্দ্র,বেগম মন্নুজান সুফিয়ান আপা, সিটি কলেজের অধ‍্যক্ষ রাজ্জাক ভাই, স্থানীয় নেতারা এবং ঢাকা থেকে আগত জননেত্রীর সফরসঙ্গীরা।

শীতের আমেজ তখনো কাটেনি তবুও উত্তেজনায় আমি ঘামতে শুরু করি। খুলনায় জনসভা শেষ করে সভানেত্রী যাবেন নিজ নির্বাচনী এলাকা বাগেরহাটে। হৈচৈ এর মধ্যে বুঝতে পারলাম সভাস্থলে দেরীতে পৌঁছনোর কারণে প্রোগাম ছাটাই করা হয়েছে। গানের ফাঁকে বতর্মানে টিভি রিপোর্টার রাহুল রাহার একক আবৃত্তি এবং আমাদের সকলের অংশগ্রহণে প্রথমে শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তুমি ” এবং পরে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর “বাতাসে লাশের গন্ধ” কবিতা দুইটি কোরাস পরিবেশনা করার সুযোগ হয়। এযেন ১৯৭১ সালে জন্ম গ্রহণকারী, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী এক তরুণীর স্বপ্ন পূরণের দিন।

এরপর জননেত্রীর নন্দিত পথচলায় প্রিয় নেত্রীকে অনেকবার দেখেছি। রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে,কখনো বিরোধী দলীয় নেতা, কখনো দুরদৃষ্টি সম্পন্ন সফল রাষ্ট্রনায়ক আবার কখনোবা দলীয় প্রধান হিসেবে। সেদিনের তুলনায় তিনি আজ বুদ্ধিতে শাণিত, রাজনীতিতে প্রজ্ঞাবান, কূটনীতিতে চৌকষ, কাজে দক্ষ, অফুরন্ত জীবনীশক্তি ও মানবতাবোধ সম্পন্ন একজন সফল মানুষ। অসীম ধৈর্য, সাহসিকতা, অদম্য, ন্যায়-অন্যায় বিচারের ক্ষমতার অনন্য সমাবেশ ঘটেছে তাঁর ব্যাক্তিত্বে। প্রগাঢ় বাস্তবধর্মিতা, সুগভীর জীবনবোধ এবং অভিজ্ঞতাই তাঁর ব্যাক্তিত্বকে করেছে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তিত্ব জননেত্রীর ৭৪ তম জন্মবার্ষিকী। শ্রদ্ধা জানাই ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারীতে আমার লেখা “খুব ভালো আছি” কবিতাটি নিবেদনের মাধ্যমে-

কেমন আছি ?

প্রশ্ন করলে অবাক হ্নদপিন্ডে লাগে উত্তাপ

এলোমেলো করে ঝড়ের ঝাপটায় টেনে আনি স্মৃতির এলবাম।

১৯৫২

ভাষা চাই- আমার মায়ের ভাষা

ছোপ ছোপ রক্ত বিছানো রাজপথ

আমার ভাইয়ের লাশ বিছানো রাজপথ ধরে

হাঁটতে হাঁটতে আমার বাবা শহীদ হলেন।

‘৭১’ এ ঘাতকের বুলেট থমকে দিল

তাঁর ভালবাসার বাগানের বেবাক রোদ্দুর।

আমার মা বেশিদিন ছিলেন না বেঁচে

বছর না ফুরাতেই ফুরিয়ে গেল

কত চাপা কান্না ঢেকে ঢেকে

জানালার চৌকাঠ ধরে ধরে।

চারটি অক্ষর একটি নাম স্বা-ধী-ন-তা

ঐ স্বাধীনতায় আমার বোন-বড় বোন

ফুল স্বভাবী আমার সেই বোন পাপ ফসল লুকাতে

ভৈরব জলের চাদর গায়ে জড়ালো।

সেইথেকে

মাটি খামছে বেঁচে রইলাম

আমি আর আমার ছোট ভাই অপু

মা-বাবার শেষ প্রতিনিধি হয়ে।

ওকে মেরো না-না-না গুলি ছুঁড়োনা

তোমরা তো হানাদার নও

আমার একটি ভাই আর আমি মুক্তিযুদ্ধের

‘৯০’ কেড়ে নিল সব শেষ অপুকে।

আর আজ তোমরা’৯২’ এ শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে

প্রশ্ন করছো, উৎফুল্লভাবে প্রশ্ন করছো -কেমন আছি?

আমি ভালো আছি! ভালো আছি!!

খুব ভালো আছি!!!

 লেখকঃ প্রকৌশলী রেশমা আখতার, সাংগঠনিক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ (বিপিপি)

LEAVE A REPLY