শুভ জন্মদিন: দ্রোহ-প্রেম-মানবতাবাদী কবি।

0
15
্যৈষ্ঠমাস একদিকে যেমন রুষ্ঠ অন্যদিকে তেমন উদার দাতা। জ্যৈষ্ঠের খরায় অগ্নিবীণা ফুলকি ঝরায়। আবার জ্যৈষ্ঠের ঝড়- বৃষ্টি বিভীষিকার মধ্যে শীতল পরশ বুলায়। জ্যৈষ্ঠের এই পরস্পর বিরোধী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই যেন ১৮৯৯ সালের ২৫ মে জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ধরাধামে আবির্ভূত হন। আজ ১১ই জ্যৈষ্ঠ দ্রোহ-প্রেম-মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২ তম জন্মবার্ষিকী।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২১ সালে অন্যায়, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বিপ্লব ও দেশপ্রেমের উদ্দীপনাময় “বিদ্রোহী” কবিতা লিখে যুগেযুগে জনমনে দ্রোহের আগুন জ্বালাতে যিনি অগ্রগণ্য তিনিই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
বহু বিচিত্র ও বিস্ময়কর তাঁর জীবন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত শৈশব,লেটোর দলের শিশুশিল্পী, রুটির দোকানের কারিগর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী যোদ্ধা, ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অপরাধে কারাবরণ, পত্রিকার সম্পাদক, মসজিদের ইমামতি – কি নেই তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে? আর সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতার জাল বুনে আমাদের উপহার দিয়েছেন কালজয়ী কবিতা, উপন্যাস, নাটক, সঙ্গীত,প্রবন্ধ, গল্প।
সাহিত্যের সকল শাখায় আমরা তাঁর প্রতিভার উজ্জ্বল পরিচয় পাই। তাঁর ভাষণ, সম্পাদকীয়, সমালোচনা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছোটগল্প ভাষার কাব্যিক ব্যঞ্জনা ও বলিষ্ঠতায় পূর্ণ। সংস্কার ও বন্ধনমুক্তি তাঁর সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। “মুক্তি ” কবিতা লিখে তাঁর কবিতার হাতেখড়ি। আরবি- ফারসি শব্দের সার্থক ব্যবহার তাঁর কবিতাকে বিশিষ্টতা দান করেছেন। এনেছেন সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা। জয়কীর্তন করেছেন তারুণ্যের। লিখেছেন “যৌবনের গান” যেখানে তারুণ্য শক্তিকে দেখি – ‘তরুন নামের জয়মুকুট শুধু তাহারই যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতিবেগ ঝঞ্চার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ় মধ্যাহ্নের মার্তন্ড প্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অটল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে।
যৌবনের বিদ্রোহ এবং প্রতিবাদের ধর্মের বহি:প্রকাশ –
” আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাতৃর!
যৌবনের অপর ধর্ম প্রেমমুলক রচনা “চক্রবাক”।
আবেগের প্রাবল্য থেকে সূচিত এই দুই ধর্মের অনুভূতিতে তিনি “যৌবনের কবি”।
পরিবেশ চেতনা ও প্রকৃতির প্রতি ভালবাসার নিদর্শন “ঝিঙে ফুল” কবিতা। কলম ধরেছেন মানবসভ্যতার রূপকার শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে। লিখেছেন “কুলিমজুর” কবিতা। যেখানে শ্রমজীবী মানুষ -কুলি-মজুরদের সন্মানিত করেছেন পুরানের ত্যাগী মুনি দধীচির সাথে তুলনা করে।
“যে দধীচির হাড় দিয়ে ঐ
বাষ্প শকট চলে,
বাবু সাব এসে চড়িল
তাহাতে, কুলিরা পড়িল
তলে।
আবার “নারী ” কবিতা স্বীকৃতি দেয় সভ্যতা সৃষ্টিতে নারী -পুরুষের সমান অবদান।
“বিশ্বের যা -কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
একইভাবে পুরুষশাসিত সমাজের একজন হয়েও সাহসিকতা দেখিয়েছেন ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় –
‘অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়”।
ব্রিটিশ শাসকের সিংহাসন কাঁপানো সৃষ্টি – আনন্দময়ীর আগমন, বিদ্রোহী ও প্রলয় শিখার কারণে ১৯২২ সালে এক বছর ও ১৯৩০ সালে তাঁর ছয়মাসের কারাবরণ। পায়ে বেড়ি তবুও তিনি সৃষ্টির উল্লাসে মেতেছেন।
রচনা করেছেন ‘ আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’।
তিনি চার হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন। বাংলা ভাষায় প্রথম ইসলামী গান ও গজল রচনার কৃতিত্ব তিনিই দেখিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে লিখেছেন – খেয়াল, রাগপ্রধান ও শ্যামাসঙ্গীত।
তাঁর রচিত “রণ সঙ্গীত ” চল চল চল, কারার ঐ লৌহ কপাট, শিকল পরার ছল ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। প্রবন্ধগ্রন্থ “রুদ্র মঙ্গল” এ ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে তিনি ‘আমি’র আগমন প্রত্যাশা করেছেন। তিনি মানুষকে পূর্ণ ‘আমি’ করতে চেয়েছেন।
যে সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় সেই অন্তরগত সত্যের সন্ধান করেছেন “সাম্যবাদী” কবিতায় – কেন খুঁজে ফের দেবতা -ঠাকুর মৃত-পুথি-কঙ্কালে? হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে! চন্ডীদাসের অমর বাণী ‘ সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।
বাঙালি জাতির এই বীজমন্ত্রে দীক্ষিত কবি খুঁজে পেয়েছেন সেই অন্তরগত সত্য। লিখেছেন “মানুষ’ কবিতা। গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি। পরিশেষে, তাঁর এই দ্রোহ-প্রেম-মানবতাবাদী চেতনা যুগে যুগে মানুষকে অণুপ্রাণিত করবে এবং আমার আমিকে খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।
রেশমা আখতার (ডলি)
সাংগঠনিক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ ( বিপিপি)

Warning: A non-numeric value encountered in /home/protidinerkhobor/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 353

LEAVE A REPLY