নজরুলের স্বপ্ন কান্ডারী : বঙ্গবন্ধু

0
103

প্রকৌশলী রেশমা আখতার(ডলি)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২১ সালে অন্যায়, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ,বিপ্লব ও দেশপ্রেমের উদ্দীপনাময় “বিদ্রোহী” কবিতা লিখে যুগেযুগে জনমনে দ্রোহের আগুন জ্বালাতে যিনি অগ্রগণ্য তিনিই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
বাঙালি জাতিকে মুক্তির আলো দেখাতে, বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করতে, জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতেই যেন, তিনি এধরাধামে আবির্ভূত হন ১৮৯৯ সালের ২৪ শে মে।
অপরদিকে সর্বপ্রকার অন্যায়- অবিচার, শোষণ -যন্ত্রণার বিরুদ্ধে যিনি ছিলেন এক সোচ্চারিত বজ্রকন্ঠ, যাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি কোন রক্তচক্ষু, গণ-অধিকার হরণকারী সামরিক জান্তার বুলেট, বেয়নেট, বন্দুক, পারেনি সংগ্রামী আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুৎ করতে, আজও যাঁর নাম শুনে শোষকের সিংহাসন কাঁপে তিনিই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাতে তাঁর আগমন ঘটে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ।
বঙ্গবন্ধুর শৈশব -কৈশোর-তারুণ্যের সময়কালে রবীন্দ্র- নজরুল সাহিত্যের আকাশে দীপ্তিময়তার সাথে বিরাজমান। ২১ বছরের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অসমাপ্ত আত্নজীবনীতে তিনি লিখেছেন ” একটা ঘটনার দিন তারিখ আমার মনে নেই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে, ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স, শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁরা হলেন কবি কাজী নজরুল, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহিম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না, ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ুন সাহেবের বাড়িতে।কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন”।
বঙ্গবন্ধু বলতেন, রবীন্দ্রনাথ, বার্নাডশ’, কেনেডি, মাও সেতুং এর মত নজরুল সম্পর্কে আমার ছিল অদম্য কৌতূহল। সঙ্গত কারণে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে নজরুলের সৃজনশীল কর্মের প্রভাব স্পষ্ট। তাঁর জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নজরুলের বিদ্রোহী ও বিপ্লবী সত্তা, গভীর দেশপ্রেম, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান ও চেতনায় প্রদীপ্ত হয়েছেন।
বিদ্রোহী ও বিপ্লবের কবি নজরুল এবং রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু দুজনের জীবনে রয়েছে কারাভোগের ইতিহাস। ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নজরুল রচনা করেন ব্রিটিশ শাসকের সিংহাসন কাঁপানো অমর কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ৭৯ লাইনের এই কবিতায় হিন্দু – পুরানের বিভিন্ন দেব-দেবীর উপমার আবরনে জ্বালাময়ী শব্দচয়নের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনামলের কুকীর্তির কারণ এবং ধরণ তুলে ধরেন। আনন্দময়ীর আগমনে এবং বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ প্রকাশের পর তাঁকে একবছর কারাবরণ করতে হয়। ১৯৩০ সালে ‘প্রলয় শিখা’ রচনার জন্য তিনি পুনরায় ছয় মাসের জন্য কারারুদ্ধ হন।
পক্ষান্তরে,পাকিস্তানি শাসকের অন্যায় -অত্যাচার-নিপীড়ন, শোষণ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ আমলে সাত দিন এবং পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের মধ্যে ৪ হাজার ৬৭৫ দিন কারাগারে কাটান।
নজরুলের বিদ্রোহী কবিতায় -” যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন- রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-
অত্যাচারীর খড়গ কৃপণ ভীম রণ-ভুমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
নজরুলের এই সংগ্রামী চেতনার প্রতিফলন ঘটে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে- ” সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না”।
নজরুল আজীবন সংগ্রাম করেছেন জাতি -ধর্ম ভেদাভেদের বিরুদ্ধে। তিনি কবিতা,গান, প্রবন্ধ প্রভৃতি মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন অসাম্প্রদায়িক চেতনা । তিনি লেখেন –
‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম
হিন্দু – মুসলমান
মুসলিম তার নয়নমণি
হিন্দু তাহার প্রাণ”।
এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণেও লক্ষণীয়। বঙ্গবন্ধু বলেন- ” এই বাংলায় হিন্দু -মুসলমান, বাঙালি, অ-বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয় “।
যেখানে মানবতার অবমাননা সেখানে নজরুলের উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি বাণী ক্ষুরধার। মানুষ কবিতায় কবির উদাত্ত আহবান-
“কোথা চেঙ্গিস, গজনি মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা – দেওয়া দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
একইভাবে নিপীড়িতদের পক্ষে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর হুশিয়ারি উচ্চারণ -‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
নজরুল পুরুষশাসিত সমাজের একজন হয়ে সাহসিকতা দেখিয়েছেন ‘বারাঙ্গনা’ কবিতা রচনার। আর বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। দেন নিজ সন্তানের স্বীকৃতি।
বাংলার ঘুমন্ত মানুষকে জাগানোর উদ্দেশ্যে ‘ বাঙালির বাংলা ‘ প্রবন্ধে নজরুল আশাবাদ ব্যক্ত করেন -” বাংলা বাঙালির হোক! বাংলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক। আর বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দিয়েছেন ‘জয়বাংলা’।
নজরুলের ভাঙ্গার গান কাব্যের অন্তর্গত ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় পাই-
“জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র” জয় জয় আদি অন্তরীণ!
জয় যুগে -যুগে -আসা-সেনাপতি,জয় প্রাণ আদি অন্তহীন!
একারণে গবেষক শামসুজ্জামান খান তাঁর ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব ও জয়বাংলা ‘ গ্রন্থে লিখেছেন ‘জয় বাংলা শ্লোগান’ এর জন্য নজরুলের কাছে বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে ঋণী।
নম নম নমো বাংলাদেশ মম, চির মনোরম চির মধুর। – নজরুলের এই গানে ১৫ লক্ষ বর্গমাইলের যে স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয় আমরা পাই তা ৬১০ খ্রী: দুর্ধর্ষ মহানায়ক যশোধর্মন প্রতিষ্ঠা করেন। আর ১৯৭১সালে প্রায় দেড় লক্ষ বর্গমাইলের স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
জাতীয় ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে,ক্রান্তিকালীন সংকটে,স্বাধীনতা আন্দোলনের কালান্তরে রচিত নজরুলের “কান্ডারী হুশিয়ার” কবিতায় : ‘কে আছো জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ/ এতুফান ভারী,দিতে হবে পাড়ি,নিতে হবে তরী পার।। এই কবিতায় নজরুল মুক্তির পতাকা ধারণ করতে যে জোয়ানের আহবান করেন, যে দিশারীর কামনা করেন, বাঙালির জীবনে সেই দিশারী হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের পরও নজরুলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর শৈশব-কৈশোরের সেই অদম্য কৌতূহলের বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি। একারণে তিনি ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে নির্বাক কবি নজরুলকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করেন। তাঁর রচিত চল চল চল কবিতাকে দেন ‘রণ সংগীতের’ স্বীকৃতি।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কুখ্যাত খুনীচক্রের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শহীদ হন। ঠিক এক বছর পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ এই দুই মহামানবের কেউই আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে বেঁচে নেই। কিন্তুু আছে নজরুলের বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ। আছে বাঙালি। আর আছে সেই অমর শ্লোগান “জয়বাংলা”।

প্রকৌশলী রেশমা আখতার(ডলি)
সাংগঠনিক সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ।

LEAVE A REPLY